January 17, 2017

ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে শিক্ষকের মর্যাদা ও অধিকার


মুসলিম সমাজে শিক্ষক মাত্রই বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তাই শিক্ষকদের প্রতি আমাদের সবার সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো উচিত। কারণ শিক্ষকেরা মানুষ তৈরির কারিগর। শিক্ষকেরা জাতির প্রধান চালিকাশক্তি। সত্যম, শিবম, সুন্দরমের পথ হচ্ছে একজন আদর্শ শিক্ষকের সাধন-দর্শন। এককথায় বলা যায়, শিক্ষক মানুষ চাষ করেন। যে চাষাবাদের মধ্য দিয়ে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটিয়ে নীতি-নৈতিকতা ও জীবনাদর্শের বলয় একজন শিক্ষার্থী তার ব্যক্তিগত ও কর্মময় জীবনকে মুখরিত করে। পাশাপাশি পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র তার দ্বারা উপকৃত হয়। মহানবী (সা.) যে ঐশীজ্ঞান অর্জন করেছেন, সে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি মানবজাতিকে সৃষ্টিকর্তা, মানুষ ও প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের নীতিমালা শিক্ষা দান করেছেন। তিনি নিজেই এ পরিচয় তুলে ধরে ঘোষণা করেছেন, ‘শিক্ষক হিসেবে আমি প্রেরিত হয়েছি।’
পবিত্র কোরআনের প্রথম নাজিলকৃত আয়াতে জ্ঞানার্জন তথা বিদ্যাশিক্ষার অধিকারী হতে বলা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন,


‘পাঠ করো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এক বিন্দু জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করো! আর তোমার প্রতিপালক পরম সম্মানিত। যিনি কলমের দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না।’ (সূরা আল-আলাক, আয়াত: ১-৫) আল-কোরআনের শিক্ষার আলোকে জ্ঞানার্জনের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে ইসলামের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর ওপর বিদ্যা অর্জন করা ফরজ।’ (বায়হাকি ও ইবনে মাজা)
একজন প্রাজ্ঞ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সত্যিকারভাবে শিক্ষিত শিক্ষক সমাজ বদলে একটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। আদর্শ শিক্ষকই শুধু আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করিতে পারেন। এ জন্যই শিক্ষকতাকে অপরাপর পেশার মানদণ্ডে পরিমাপ করা যায় না বলে অনাদিকাল থেকে এটি একটি সুমহান পেশা হিসেবে সমাজ-সংসারে পরিগণিত। কারণ জ্ঞানই মানুষের যথার্থ শক্তি ও মুক্তির পথ নির্দেশ দিতে পারে। এ মর্মে নবী করিম (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘দুই ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারও পদ-গৌরব লোভনীয় নয়। তা হলো ১. ধনাঢ্য ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেছেন এবং তা সত্পথে ব্যয় করার ক্ষমতা দিয়েছেন। ২. ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ বিদ্যা দান করেছেন এবং সে অনুসারে সে কাজ করে ও অপরকে শিক্ষা দেয়।’
সলামের দৃষ্টিতে শিক্ষকতা সমাজের একটি অতি সম্মানিত পেশা। সামাজিক দায়িত্ব ও মর্যাদার দিক থেকে শিক্ষকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও জাতীয়ভাবে শিক্ষকদের তেমন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় না। দেশে অন্যান্য পেশার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র মনোযোগী হলেও শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বেশ অবহেলা আর উদাসীনতার পরিচয় দেয়। যুগের পর যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু শিক্ষকদের নির্মম ভাগ্য আজও বদলায়নি। বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষকদের বেলায় এ উদাসীনতা মাত্রাতিরিক্ত। শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। এ ভিত্তি গড়ার মূল কারিগর হলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। শিক্ষা অনুযায়ী মানব চরিত্র ও কর্মের সমন্বয় সাধনই হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তাগিদ। নিজে শিক্ষা অর্জন করার পরক্ষণেই অপরকে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত ও চরিত্র গঠন করার দায়িত্বও শিক্ষকের। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে ‘আল্লাহর পরে, রাসুলের পরে ওই ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা মহানুভব যে বিদ্যার্জন করে ও পরে তা প্রচার করে।’ (মিশকাত)
শিক্ষাদানের পাশাপাশি আদমশুমারি, ভোটার তালিকাভুক্তি, টিকাদান, শিশু জরিপ, উপবৃত্তি বিতরণ, স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রমে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সারা দেশে পাড়াগাঁয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার পরও তাঁদের হোম ভিজিটসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকতে হয়। ছাত্রছাত্রীর তুলনায় দেশে শিক্ষক-শিক্ষিকা খুবই কম। অপ্রতুল শিক্ষা-উপকরণ ও বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে তাঁরা বিরতিহীনভাবে শিক্ষাদান কার্যক্রম চালিয়ে যান। এভাবে বিরতিহীনভাবে বছরের পর বছর শিক্ষাদানের ফলে অনেক শিক্ষক জীবনসায়াহ্নে এসে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তাঁরা জাতিকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে নিজেরা মোমের মতো নিঃশেষিত হন। ফলে শিক্ষকতা ছাপোষা শ্রেণীর একটি পেশা হিসেবে সমাজে স্বীকৃত হয়। এ জন্য সত্যিকারার্থে শিক্ষকতার মানসিকতা থাকা সত্ত্বেও অনেকটা সুবিধাবঞ্চিতদের মতো অনেক প্রাথমিক শিক্ষকই জীবন-জীবিকার কঠিন আঘাতে হয়ে পড়েন মলিন। অথচ রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, ‘শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ব্যতীত কেউই আমার আপন নয়।’
শিক্ষকের জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট অর্থের প্রয়োজন হয়। অথচ এই মহান পেশায় যাঁরা নিয়োজিত, তাঁদের নেই কোনো অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা। সামাজিক মর্যাদা ও সম্মানজনক জীবনধারণ উপযোগী বেতন-ভাতা না থাকায় মেধাবীরা শিক্ষকতায় আকৃষ্ট হচ্ছেন না। শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব, এ দুর্মূল্যের বাজারে বেতন-ভাতার অপ্রতুলতা, শিক্ষাকে রাজনীতিকরণ এবং বাণিজ্যিকীকরণের উদ্ভট মানসিকতা, শিক্ষকদের প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সীমাহীন ঔদাসীন্য ও অবহেলাই যেন এ পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য বহুলাংশে দায়ী। তাই শিক্ষকদের বেতন-কাঠামো এমন হতে হবে, যাতে সমাজে শিক্ষকতা পেশার গুরুত্ব ও মর্যাদা, শিক্ষকতায় কোনো ব্যক্তির যোগদান তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিফলিত হয় এবং শিক্ষকদের মধ্যে বেতনসংক্রান্ত কোনো বৈষম্য বা সংঘাতের সৃষ্টি না করে। জ্ঞান অন্বেষণের গুরুত্ব ও শিক্ষকের মর্যাদা প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন, ‘যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে?’ (সূরা আয-যুমার, আয়াত-৯)
জ্ঞাননির্ভর সমাজ গঠনে প্রয়োজন মানুষ গড়ার কারিগর। তাই শিক্ষকদের পর্যাপ্ত পেশাগত স্বাধীনতা থাকা দরকার। যেহেতু শিক্ষকেরা শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়াদি—যেমন, শিক্ষার উপকরণ ও শিক্ষা পদ্ধতি বিষয়ের—বিশেষভাবে ওয়াকিবহাল, সেহেতু তাঁদের ওইসব বিষয় নির্বাচন কিংবা নির্ধারণ করার স্বাধীনতা দিতে হবে। শিক্ষকেরা যাতে পাঠ্যপুস্তক কিংবা শিক্ষাদান সংশ্লিষ্ট পদ্ধতি অনুমোদিত কর্মসূচির আওতায় শিক্ষাসংক্রান্ত কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন সে বিষয়ে তাঁদের পর্যাপ্ত সুযোগ দান করতে হবে। শিক্ষকেরা সমাজের বিবেক ও স্পন্দন। সামাজিক কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি দূর করার ব্যাপারে শিক্ষকদের অবিস্মরণীয় অবদান আজও এ ভূখণ্ডের মানুষেরা ভক্তিভরে স্মরণ করে। শিক্ষকেরা হচ্ছেন দেশ গড়ার প্রধান নিয়ামক শক্তি। তাই ইসলামের আলোকে শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদা অন্তত নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষাদানে তৈরি করে তুলতে হবে। জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীন দেশে পর্যন্ত যেতে বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন করো।’বিশ্ব শিক্ষক দিবস (৫ অক্টোবর) বিকশিত অবদানের মাধ্যমে সচেতনতা, সমঝোতা এবং উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, যা শিক্ষকদের শিক্ষার প্রগতিকে আরও প্রসারিত করবে নিঃসন্দেহে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে শিক্ষার স্বীকৃতি আদায় করে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ ও শিক্ষাদাতা শিক্ষকদের প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষকসমাজ আজ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বৈষম্য-বঞ্চনার অবসান দাবিতে, নির্যাতন-নিপীড়ন প্রতিরোধে শিক্ষকের ন্যায্য অধিকার রক্ষার উদ্দেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাঁদের মূল ধ্বনি: ‘শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে, শিক্ষা বাঁচলে দেশ বাঁচবে’। দেশব্যাপী শিক্ষকদের বৈধ অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষা করা, শিক্ষকদের জীবনের মান উন্নত করার ব্যাপারে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা, আদর্শ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করা এবং শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করা সর্বোপরি দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
মূল প্রবন্ধ লেখকঃ  ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
Post a Comment