January 8, 2017

প্রাথমিক শিক্ষায় উন্নয়নঃ ব্লাক বোর্ড থেকে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর


শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। আর শিক্ষার ভিত্তি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হাতেই শিশু শিক্ষার হাতেখড়ি ঘটে। প্রাচীনকালে শিক্ষা ছিল গুরুকেন্দ্রিক। সাধারণত গুরুর বাড়ির বৈঠক ঘর, নদীর পাড়ে, হাটের কাছে চলত প্রাথমিক শিক্ষা। পড়াশুনা ছিল শিক্ষক কেন্দ্রিক। শিক্ষকগণ  


লেখাপড়া পরিচালনায় উপকরণ হিসেবে সাধারণত কাঠের তৈরী বোর্ড কালো রং করে তা টানিয়ে সাদা চক পেন্সিল দিয়ে লেখা শিখাতেন। সেজন্য এ বোর্ডকে কালো বোর্ড বা ব্ল্যাক বোর্ড বলা হয়।
স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ঘোষণায় প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করে নেন। তখন এদেশের অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল কাঁচা বা আধাপাকা টিনের ঘর। শিক্ষকগণ লেখালেখি ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে চকবোর্ডের উপর নির্ভরশীল ছিল। শিক্ষার্থীরা অবশ্য মাটির শ্লেটে পেন্সিল দিয়ে লিখা শিখতো। নব্বইয়ের দশকে প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোকে পাকাভবনে রূপান্তরের কাজ শুরু হলে দেয়ালে কালো রং করে বোর্ড হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। আর শিক্ষার্থীরা কাঠের কালো শ্লেটে চক পেন্সিল দ্বারা লেখা শুরু করে।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকার নানান ধরণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আইডিয়ালস ও এস্টিম প্রকল্প। এ দুটি প্রকল্প এদেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে চক বোর্ডের পরিবর্তে ভিপ বোর্ড, হুয়াইট বোর্ড, ফ্লিপ চার্ট, মার্কার, OHP মেশিন, ট্রান্সপারেন্সী সিট ইত্যাদি ব্যবহার শুরু করে। এতে শিক্ষকরা এ ধরণের উপকরণ ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠে। প্রথম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচী চলাকালে প্রতি উপজেলায় মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে ল্যাপটপ প্রদান করা হয়। দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচী চলাকালে মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও ২টি করে বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রদানের পাশাপাশি শিক্ষকদের  ICT বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এর ফলে বিদ্যালয় গুলোতে ডিজিটাল কন্টেন্ট এর আলোকে ডিজিটাল শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়। মাল্টিমিডিয়া ব্যবহারের ফলে শিশুদের বিদ্যালয়ের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি, উপস্থিতি বৃদ্ধিসহ পাঠে মনোযোগ সহকারে অংশগ্রহণ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। মূলত: এমডিজি অনুযায়ী আমাদের প্রাথমিক শিক্ষায় সফলতা আসে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রানুযায়ী (এসডিজি) মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচীর আওতায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরির বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ফলে মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহারের ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। জটিল বিষয়গুলো সহজ ও আকর্ষণীয় এবং আনন্দ ঘনভাবে উপস্থাপনের ফলে শিক্ষার্থী উপস্থিতিসহ শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমে অংশ গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।সরকারের পাশাপাশি এসএমসি ও স্থানীয় বিদ্যুৎসাহী ব্যক্তিবর্গও ডিজিটাল ক্লাসরুম চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করে। সাম্প্রতিক কালে কয়েকটি জাতীয় দৈনিক দেশের বিভিন্ন এলাকায় কম্পিউটার ও মাল্টিমিডিয়া সমৃদ্ধ বিদ্যালয় নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে সমাজের সর্বস্তরের ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। এখন বিদ্যালয় ব্যাপস্থাপনা কমিটিসহ স্থানীয় জনগণ কিভাবে তাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আইসিটি সমৃদ্ধ করবে তা নিয়ে ভিতরে ভিতরে প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছে। মূলত: মাল্টিমিডিয়ায় পাঠদান বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে এক নিরব বিপ্লবের সূচনা করেছে। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে কম্পিউটার/ল্যাপটপ প্রদানের পাশাপাশি মডেম দিয়ে সরকার প্রতিটি বিদ্যালয়কে অনলাইন নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এখন শিক্ষকগণ বিদ্যালয়ে বসেই ই-মেইলে যে কোন তথ্য আদান-প্রদান করতে পারছেন। তাছাড়া ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরিতে শিক্ষকগণ বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে সকল হচ্ছেন। বর্তমানে শিক্ষকগণ বিশ্বশিক্ষা ব্যবস্থার সাথে বিদ্যালয়ে বসেই পরিচিত হবার সুযোগ পাচ্ছেন। কাজেই খুব দ্রুতই যে উন্নতি ঘটবে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার এতে কোন সন্দেহ নেই।
Post a Comment